Showing posts with label সাফল্য. Show all posts
Showing posts with label সাফল্য. Show all posts

অক্ষরগুলোর সাথে ঘনিষ্ঠতা

আমাদের লেখাপড়ায় হাতেখড়ি হয় বর্ণমালা দিয়েই, যদিও অক্ষরগুলোর সাথে ঘনিষ্ঠতা দূরে থাক, পরিচয় হওয়ার অনেক আগেই আমরা শিখে যাই পাগলা ঘোড়ায় চড়ে তেড়ে আসতে আসতে বুবুকে ধমকে দিতে, কিংবা চাঁদকে নিজের কপালে টিপ দিতে অনুরোধ করতে করতে অজ্ঞাতসারেই মামা ডেকে বসা অথবা, শিখে ফেলি Humpty Dumpty জুটির গল্প। তারপরও আমাদের মোটামুটি সবার পড়াশুনাটা বাংলা বর্ণমালা দিয়ে শুরু হয়ে ইংরেজিতে নোঙর ফেলে অংকের বন্দরের দিকে নতুন করে পাল ওঠানোর মধ্য দিয়ে এগিয়ে চলে। ক্ষেত্রবিশেষে ব্যতিক্রম থাকলেও অধিকাংশের গল্পগুলো মনে হয় এরকমই।
যে সময় মা-বাবারা খুঁজে খুঁজে সেই চারপাতা রঙিন প্লাস্টিকের বইগুলো কিনে এনে আমাদের সাগ্রহে “অ” “আ” “ই” “ঈ” পড়িয়ে পন্ডিত বানানোর চেষ্টায় রত, আমরা তখন বইয়ের পাতায় গাছের ডালে ঝুলে থাকা আম পারার জন্যে লাফ দেই কিংবা, পেঁচানো অজগর দেখে আতঙ্কে চিৎকার দেই অথবা এমনও হয় বক পাখি দেখে উড়ে যাবার বাসনা পরিতৃপ্ত করতে দু’হাত দু’দিকে ছড়িয়ে বোঁ-বোঁ শব্দে ঘরময় ছুটে বেড়াই, পড়াশুনার থোড়া্ই কেয়ার করে।
মা-বাবারা হতাশ হন। বাবা অফিসে চলে যান, অবসর পেলে পত্রিকা পড়ার ফাঁকে একটু-আধটু পড়াতে বসেন। আর মা তো হেঁশেল সামলাতেই ব্যস্ত। তারপরও সবসময় কেমন করে যেন মায়ের অখন্ড অবসর। সবসময়ই মুখে যেন ছন্দে ছন্দে বর্ণমালাগুলোর খেলা চলা। তাতেই অনেকটা সময় নিয়ে একটা একটা করে বর্ণ শেখা, বর্ণগুলোকে আত্মার বাঁধনে বাঁধা, ভবিষ্যতে পেট চলার জন্য এগুলোর উপর ভরসা করতে হবে এই চেতনায় উজ্জীবিত হয়ে আরো বেশি করে এগুলোকে ভালোবেসে ফেলা।
ছেলেবেলায়, যখন আমাদের হাফপ্যান্ট পরারও বয়স হয়নি, নিয়ম করে রোজ বিছানা ভিজাই, প্রতিরাতেই মায়ের সাথে ঘুমাবো বলে বায়না ধরি, আর, মা ভাত খেয়ে এসে ঘুম পাড়িয়ে যেতেন ঘুম পাড়ানি মাসি-পিসিদের ডেকে কিংবা চড়ুই পাখির চুরি করে ধান খেয়ে ফেলার কারণে আক্রমণ করা বর্গীদের ভয় দেখিয়ে অথবা little starগুলোকে যখন twinkle নামে ডাকতেন তখন কেন জানি খুব করে বর্ণমালাগুলোকে নিজের সম্পত্তি বলে মনে হত। কাউকে দেবো না, এমন একটা ভাব।
সাইকেল চালাতে শিখবো বলে বায়না ধরায় মা’র অনুরোধে বাবার ২ বছরের প্রতিরোধ ভাঙে ৩য় শ্রেণীতে এসে। প্রতিজ্ঞা করতে হয়, ১ম-৩য় অবস্থানে থাকার শ্রেণীতে। সবসময় সবকিছুতে বেশি বেশি করে চাওয়া মানুষগুলো অযথাই পরীক্ষার ফলের ব্যাপারে কম হয়েছে শুনলেই বেশি খুশি হয়ে উঠতো। এই ফলাফলে অবস্থানের সংখ্যামানের নিম্নগতির সাথে মানুষের খুশি হওয়ার হারের ব্যস্তানুপাতিকতার কারণ ছোটমাথায় তখনো পরিস্কার না হলেও কখনো ৫ এর কমে আসতে না পারা সেই ছেলেটি সবাইকে অবাক করে দিয়ে প্রথম সাময়িক পরীক্ষায় ৩য় হয়ে যায়। খুশিতে বাকবাকুম ছেলেটির স্বপ্নজুড়ে সাইকেলের ছবি আঁকা ঘুড়িটা হুট করে ছিঁড়ে যায় “১ম সাময়িক আর বার্ষিক পরীক্ষার ফলাফলের মাঝে পার্থক্য আছে” হঠাৎ উদ্ভুত এই তত্ত্বের প্যাঁচে পরে। সাইকেল আর পাওয়া হয় না। শেখা হয় না সাইকেল চালানো, শেখা হয় না সবদিক সামলে নিজের ভারসাম্য রক্ষার প্রথম পাঠ, যা হয়ত পরবর্তীতে খুব সহজে জাত-পাত ভেদাভেদে উদ্বুদ্ধ করে। তবু, যেটা পাওয়া হয়, বার্ষিক পরীক্ষা শেষে একটা লেগো সেট, যেটা বর্ণমালাযুক্ত। শব্দ মেলাতে হয়। সেই থেকে আবার শুরু বর্ণের সাথে বর্ণের মিলনমেলা।
মায়ের হাত ধরে প্রথম যেদিন গুটি গুটি পায়ে আঁকার স্কুলে গেলাম, শিক্ষিকাকে আচমকা প্রথমবারেই ভালো লেগে গেল, কেন যেন খুব আপন বলে মনে হল, মনে হল এনার সাথে আমার বনবে, আমাকে ইনি বুঝতে পারবেন। কে জানে কেন এমন মনে হল? হয়ত, প্রথম দিনই তিনি আমাদের পাখি আঁকতে শিখিয়েছিলেন, “দ” দিয়ে, তাই। এখনো মনে আছে। “দ”এর নিচের অংশটা নৌকার মত আঁকতে হয়, আর উপরের মাত্রাটাকে আরেকটা উল্টানো নৌকার গলুই হিসেবে শুরু করে পুরোটা শেষ করলে আস্ত একটা পাখি হয়ে যায়। কি পাখি, তার নাম জানি না। কখনো জানাও হয় নি। হয়তো ইচ্ছে করেনি। আমার কাছে ওটা এখনো হয়ে আছে “দ পাখি”।
তারপর?
কেমন করে হুড়মুড়িয়ে শৈশবটা কেটে গেল। হঠাৎ করেই বড় হয়ে গেলাম। এখন আর ঘুম ঘোরে বর্ণমালাগুলো খেলে না, এখন আর বর্ণের পাশে বর্ণ, কিংবা, বর্ণের উপরে বর্ণ চড়ে বসে শব্দশৈলী করে না। এখন শব্দরা কেবল পরীক্ষার খাতায় পর পর বসে পরে বেশি বেশি নম্বরের জন্যে, মুখস্থ করে আসা কথাগুলো লিখে যাই এক এক করে। আর অনেকদিন পর হঠাৎ করে পত্রিকার পাতায় ছবি, টেলিভিশনের পর্দায় বাচ্চাদের বর্ণ নিয়ে উৎসব দেখে নস্টালজিক হয়ে যাই।

হেলেন


উনিশ শতকের রহস্যময়ী ও আশ্চর্য এক নারী হচ্ছেন ‘হেলেন কেলার’। বাক-শ্রবণ ও দৃষ্টিপ্রতিবন্ধিত্ব নিয়ে ১৮৮০ সালের ২৭ জুন উত্তর আমেরিকার টুস্কুমরিয়া নামে ছোট শহরে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবার নাম আথার কেলার এবং মায়ের নাম ক্যাথরিন। হেলেন কেলারের বয়স যখন মাত্র দেড় বছর তখন তিনি গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন। বাবা-মা প্রাণের প্রিয় কন্যার জীবনের আশা-ভরসা ছেড়ে দিলেও ভেঙে পড়েননি। চিকিৎসা করা শুরু করেন। তৎকালীন আমেরিকা পৃথিবীর একটি উন্নত দেশ হলেও আজকের মতো চ্যালেঞ্জিং চিকিৎসা ব্যবস্থা ছিল না। বহু চিকিৎসার পর জীবন রক্ষা পায়। কিন্তু ভাগ্যের কী নির্মম পরিহাস কথা বলা, শোনা এবং দেখার শক্তি চিরদিনের জন্য হারিয়ে যায়। অন্ধকার, আলোহীন আর নিস্তব্ধে ছেয়ে যায় মায়ার জীবন ও জগৎ।
ফলে শিশুকালেই হেলেন কেলার একাধারে বাক-শ্রবণ ও দৃষ্টিপ্রতিবন্ধিত্বের শিকার হয়ে বহুমুখী প্রতিবন্ধিত্ব নিয়েই বড় হতে থাকে। তার বয়স যখন মাত্র ছয় বছর তখন বাবা-মা তাকে ওয়াশিংটনের এক প্রসিদ্ধ বিজ্ঞানী, টেলিফোন আবিষ্কারক ডা. আলেকজান্ডার গ্রাহাম বেলের কাছে পরামর্শ গ্রহণের জন্য নিয়ে যান। কারণ আলেকজান্ডার গ্রাহাম বেল দীর্ঘদিন ধরে বাক-শ্রবণপ্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের উন্নয়নের লক্ষ্যে নিরলসভাবে কাজ করছিলেন। তিনি হেলেন কেলারকে প্রাথমিকভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে বলেন, হেলেন আর কোনো দিন চোখে দেখতে পাবে না এবং কানেও শুনতে পাবে না। তবুও হতাশ হওয়ার কিছু নেই। কারণ হেলেন কেলারের বুদ্ধিমত্তা তীক্ষè। সেজন্য গুরুত্বের সঙ্গে পরিকল্পনা অনুযায়ী শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হলে স্বাভাবিক জীবনের কাছাকাছি একটি সুন্দর জীবন ফিরে পেতে পারে।
পরিবারের উৎকণ্ঠা ও হতাশা কিছুটা হলেও কমে যায়। এরপর শুরু হয় শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ। মাত্র আট বছর বয়সেই হেলেন কেলার হাতে আঙুল দিয়ে দাগ কেটে কেটে লেখা, ব্রেইল পদ্ধতিতে লেখাপড়াসহ শব্দ ও বাক্য উচ্চারণ পর্যন্ত শিখে ফেলেন। এতে পরিবারের লোকজন ও আত্মীয়স্বজন অবাক হয়ে যান। সবচেয়ে আশ্চর্য বিষয় ছিল তার কথা শেখা। চোখে না দেখা ও কানে না শোনার দরুন প্রথমে একটি শব্দ ব্রেইলের মাধ্যমে জানতো। শিক্ষকের মুখের কম্পন, ঠোঁট ও জিহ্বার নড়াচড়া হাত দিয়ে অনুভব করে তা বোঝা ও অনুসরণ করার চেষ্টা করতো। প্রথম প্রথম যেসব শব্দ বলতো তা অদ্ভুত ধরনের বিকট শব্দের মতো উচ্চারিত হতো। তবুও নিরলস সাধনা করে অসাধ্যকেও সাধন করেছে, অসম্ভবকে সম্ভব করেছে।
১৪ বছর বয়সে হেলেন আমেরিকার নিউইয়র্কের ‘রাইট হুমাসন’ নামক একটি স্কুলে ভর্তি হন। এখানে বিশ্ববিখ্যাত লেখক মার্ক টোয়েনের সঙ্গে তার পরিচয় ঘটে। স্কুল ফাইনাল পাস করার আগেই তার পিতা দুনিয়ার মায়া ত্যাগ করেন। ১৯০৪ সালে হেলেন র‌্যাডক্লিফ কলেজ থেকে গ্র্যাজুয়েশন ডিগ্রি লাভ করেন।
এরপর নিজের প্রতিবন্ধিত্বের কথা উপলব্ধি করে তিনি সমাজের বাক-শ্রবণ ও দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী মানুষের জন্য সামাজিক সচেতনতা সৃষ্টি ও গণমানুষের সহায়তা অর্জনে দেশের এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্ত পর্যন্ত হাজার হাজার মানুষের সমাবেশে বক্তব্য রাখেন। হেলেন কেলার পরে দেশের বিভিন্ন স্থানে বাক-শ্রবণ ও দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের উন্নয়নে নতুন নতুন স্কুল এবং সমিতি গড়ে তোলেন।
১৯১৩ সালে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ছাত্রছাত্রীদের লেখাপড়ার জন্য আমেরিকার জাতীয় লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠিত হয়। যদিও তিনি সম্পূর্ণ দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ছিলেন কিন্তু তিনি দৃষ্টিসম্পন্ন বহু জ্ঞানী লোকের চেয়েও অধিক বেশি বই পড়েছেন। শুধু বই পড়েননি, বইও লিখেছেন। তার রচিত বইয়ের সংখ্যা ১১ খানা। প্রধান বই হচ্ছে দি স্টোরি অফ মাই লাইফ, লেট আস হ্যাভ কেইথ, দি ওয়ার্ল্ড আই লিভ ইন, ওপেন ডোর ইত্যাদি। এছাড়াও তিনি বাক-শ্রবণ ও দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অভিশপ্ত বিড়ম্বনা জীবনের বিষাদের ওপর একটি চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন। চলচ্চিত্রে তার নিজের ভূমিকায় তিনি নিজেই অভিনয় করেছেন। তার জীবনের শেষ নেই। এই মহীয়সী নারীর জীবনের দিকে লক্ষ্য করলে মনে হয় পৃথিবীতে আশ্চর্য বলতে সত্যি কিছু নেই। তিনি বাক-শ্রবণ ও দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী নারী ছিলেন অথচ স্বাভাবিক মানুষের চেয়ে বেশি সঙ্গীত উপভোগ করতে পারতেন। তার সঙ্গীত উপভোগ করার আশ্চর্য পদ্ধতি ছিল। তিনি বাদ্যযন্ত্রের ওপর হাত রেখেই বলে দিতে পারতেন তাতে কী ধরনের সুর বাজছে। হাতের স্পর্শ দিয়ে তিনি শ্রবণের কাজ করতেন আশ্চর্য বুদ্ধিমত্তা দ্বারা। গায়ক-গায়িকার কণ্ঠে হাত দিয়ে অনায়াসে বলতে পারতেন কি সঙ্গীত গাইছে। তার এমন আশ্চর্য ক্ষমতা ছিল যে, বহু দিনের পরিচিত মানুষের সঙ্গে করমর্দন করে বলে দিতে পারতেন তার পরিচয়। দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী হয়েও তিনি নৌকা চালাতে পারতেন।
তিনি দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী হয়েও নদীতে সাঁতার কাটতে পারতেন, নৌকা বাইতে পারতেন, দাবা ও তাস খেলতে পারতেন। ঘরে বসে নকশিকাঁথা সেলাই করতে পারতেন।
১৯৪১ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট রুজভেল্টের অনুরোধে হেলেন কেলার বিভিন্ন হাসপাতালে যুদ্ধাহত দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী নাবিক ও সৈনিকদের দেখতে যেতেন এবং শান্তি ও আশার বাণী শোনাতেন। যুদ্ধ শেষ হলে বাক-শ্রবণ ও দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য বিশ্বব্যাপী এক আন্দোলন গড়ে তোলার প্রয়াস পান। ১৯৫৯ সালে হেলেন কেলার জাতিসংঘ কর্তৃক বিশেষ সম্মানে ভূষিত হন।
১৯৬৮ সালের ১ জুন হৃদয়ের আলোতে আলোকিত এই মহীয়সী প্রতিবন্ধী নারী দুনিয়ার মায়া ছেড়ে স্বর্গে চলে যান। বিশ্বব্যাপী বাক-শ্রবণ ও দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী নারীর স্মৃতিকে চির অম্লান করে রাখার জন্য এবং অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৭৭ সালে ‘আমেরিকান অ্যাসোসিয়েশন ফর দি ওভারসিজ বাইন্ড’ গঠন করা হয়েছে। পরে নাম পরিবর্তন করে ‘হেলেন কেলার ইন্টারন্যাশনাল’ করা হয়েছে।

সাবিরা ইয়ামীন


সাবিরা ইয়ামীন
সমস্ত পৃথিবীটাই সাবিরার কাছে নীরব-নিঝুম। ছোটবেলা থেকেই সাবিরা শুনতে পান না। বলতে পারেন না কথা। মেয়ের পড়ালেখা হবে কি না এই ভেবে মহা দুশ্চিন্তায় পড়েছিলেন মা-বাবা। সেই সাবিরাই শেষতক কীভাবে পৌঁছে গেলেন বিশ্বের অন্যতম সেরা বিদ্যাপীঠ অক্সফোর্ড অবধি? বনে গেলেন অক্সফোর্ডের গবেষক? পড়ুন এবারের মূল রচনায়।

মেয়েটির জন্ম হয়েছিল তার যখন জন্ম হওয়ার কথা, তার দুই মাস আগেই। ১৯৮৪ সালের জুলাই মাসে। মা-বাবা দুজনই তাই অত্যন্ত উৎকণ্ঠিত ছিলেন। জন্মের পর মা তাকিয়ে দেখেছিলেন সদ্যভূমিষ্ঠ সন্তানটিকে। দেখলেন, ভারি সুন্দর। চিৎকার করে কাঁদছে। খুশি হলেন মা-বাবা দুজনই। তবে সন্তানটি বাঁচবে কি না, তা নিয়ে আশঙ্কা করলেন নামকরা ডাক্তার, দেখাশোনা করছিলেন—এই যা ভরসা। কিন্তু সন্তানটি জন্ম নেওয়ার এক সপ্তাহ পরই তার জটিল সমস্যা দেখা দিল—নিউমোনিয়া হলো। তাকে বাঁচানো যাবে কি না, সেটাই আশঙ্কার কারণ হয়ে দেখা দিল। ডাক্তার তাকে একটি অ্যান্টিবায়োটিক দিলেন ইনজেকশনের মাধ্যমে। বহু চিকিৎসা আর পরিচর্যার পর সে বেঁচে গেল। তার পরও চলল অব্যাহত যত্ন নেওয়ার পালা। কয়েক মাস বয়সের পর সে বড় হতে থাকল ধীরে ধীরে—অন্য সব সন্তানের মতো। ফুটফুটে মেয়েটির হাসি দেখে তার আত্মীয়স্বজন সবাই খুশি।
মুশকিল দেখা দিল মেয়েটির বয়স যখন দেড়-দুই বছর, তখন থেকে। দেখা গেল, মেয়েটি অন্যদের কথায় কোনো রকম সাড়াই দিচ্ছে না। সবাই আশঙ্কা করতে আরম্ভ করল যে সে হয়তো শুনতেই পাচ্ছে না! ভালো ডাক্তাররা দেখলেন তাকে, কিন্তু বিশেষ আশ্বাস দিতে পারলেন না। আরও কয়েক মাস বয়স বাড়ার পর মা-বাবা যখন নিশ্চিত হলেন সে শুনতে পাচ্ছে না, তখনই শুরু হলো বড় ডাক্তারদের চিকিৎসা। কানের বিশেষজ্ঞ দেখানো হলো ভারত, সিঙ্গাপুর, ইংল্যান্ড, আমেরিকাসহ নানা জায়গায়। একজন-দুজন নয়, অনেক ডাক্তার। তাঁরা রায় দিলেন, মেয়েটি শুনতে পায় না। অর্থাৎ, সে শ্রবণপ্রতিবন্ধী, বধির। চিকিৎসায় তেমন কোনো কাজ হবে না, তাও বললেন। কেউ বা বললেন, ধীরে ধীরে খানিকটা উন্নতি হতে পারে। চিকিৎসার সঙ্গে সঙ্গে অধীর আগ্রহে মা-বাবা উদ্গ্রীব হয়ে থাকলেন, কিন্তু সে কানে শুনতে পেল না। কয়েক বছর অপেক্ষা করেও না।
মা-বাবা তখন সন্তানটির ভবিষ্যৎ নিয়ে দারুণ দুর্ভাবনায় পড়লেন। তাঁদের অন্য তিন সন্তানই লেখাপড়ায় খুব ভালো। কিন্তু এ সন্তানটি লেখাপড়া শিখতে পারবে না—এটা ভেবে তাঁরা হতাশায় ভেঙে পড়েন! অমন সুন্দর মেয়েটি কথা বলতে পারবে না কোনো দিন! অন্যদের সঙ্গে সত্যিকার যোগাযোগ করতে পারবে না! মেয়ের ভবিষ্যতের কথা ভেবে তাঁরা চোখে অন্ধকার দেখেন। বাবা বড় ব্যবসায়ী, দেশ-বিদেশে ব্যবসা। রীতিমতো ধনী। কিন্তু তিনি দেখলেন, এই ধনসম্পত্তি সবই হয়ে যাবে অর্থহীন। তার থেকেও দুঃখের কথা: মেয়েটির জীবন হয়ে যাবে একেবারে অর্থহীন। বিদেশ থেকে ডাক্তার নিয়ে এলেন তিনি। ঢাকার শিশু হাসপাতালের অডিও বিভাগের একজন কি দুজন ডাক্তার আর নার্সদের ভারত থেকে প্রশিক্ষণ দিয়ে আনালেন। (এই হাসপাতালের অডিও বিভাগের একটি উইংয়ের নাম তার বাবা তারই নামে করে দিয়েছেন।) কিন্তু সব চেষ্টা ব্যর্থ হলো।
অতঃপর কঠিন সিদ্ধান্ত নেওয়ার পালা। একদিকে মেয়েটির ভবিষ্যৎ; অন্যদিকে নিজের পরিবার, সামাজিক সম্পর্ক, যোগাযোগ, ব্যবসা-বাণিজ্য, নিজেদের এবং অন্য সন্তানদের জীবন আর ভবিষ্যৎ। কিন্তু না, বাবা মুহাম্মদ ইয়ামীন অগত্যা অত্যন্ত দুরূহ সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললেন। তিনি ঠিক করলেন, সবকিছু ছেড়ে দিয়ে মেয়েকে নিয়ে থাকবেন এমন একটা দেশে, যেখানে মেয়েকে ঠিকমতো লেখাপড়া শেখানো সম্ভব হবে। ইংল্যান্ড থেকে যে শ্রবণ-বিশেষজ্ঞ চিকিৎসককে নিয়ে এসেছিলেন বাংলাদেশে, তিনি বুদ্ধি দিলেন ইংল্যান্ডে নিয়ে যেতে। স্কুলের সঙ্গে যোগাযোগও করিয়ে দিয়েছিলেন তিনি। ভর্তির ব্যবস্থা পাকাপাকি হলো।
তারপর বধির সন্তান, স্ত্রী আর একজন সেবিকা—ফাতেমাকে নিয়ে ১৯৯২ সালের ১০ জানুয়ারি মুহাম্মদ ইয়ামীন চলে এলেন ইংল্যান্ডের দক্ষিণ উপকূলের সুন্দর শহর ব্রাইটনে। ঘর বাঁধলেন শহরের কয়েক মাইল দূরে কাকফিল্ডে। সেখানে আছে মূক-বধিরদের স্কুল। ব্রাইটন ইনস্টিটিউশন ফর দি ইনস্ট্রাকশন অব দ্য ডেফ অ্যান্ড ডাম্ব নামে ব্রাইটনের বধির বিদ্যালয় স্থাপিত হয়েছিল ১৮৪১ সালে। শ্রবণ-প্রতিবন্ধীদের শিক্ষা দেওয়ার দীর্ঘ ঐতিহ্য রয়েছে ব্রাইটনের।কাকফিল্ডে যে বধির বিদ্যালয়, তার নাম মিল হল অরাল স্কুল ফর দ্য ডেফ। সেখানেই শুরু হলো মেয়েটির একেবারে প্রাথমিক লেখাপড়া। স্বভাবতই এ স্কুলে শিক্ষা এবং যোগাযোগের মাধ্যম ইংরেজি। এবং সেটাই মেয়েটির জন্য সবচেয়ে বড় সমস্যা হিসেবে দেখা দিল। কিন্তু ধীরে ধীরে মেয়েটি ইংরেজি বর্ণ চিনল, সংখ্যা শিখল। শব্দ, বাক্য এবং অঙ্কও। তারপর ইংরেজি পড়তে ও লিখতে শিখল। স্কুল থেকে বলা হলো মেয়েটির সঙ্গে সারাক্ষণ কথা বলতে। ঠোঁট, মুখ আর জিবের অবস্থান দিয়ে সে যাতে বুঝতে পারে কী বলছে অন্যরা; আর সেটা অনুকরণ করে যাতে সে কথা বলতে চেষ্টা করে।
মেয়েকে যদ্দুর সম্ভব ভালো শিক্ষাদানের জন্য মুহাম্মদ ইয়ামীন চেষ্টার কোনো ত্রুটি করেননি। স্কুল মেয়ের খুব ভালো যত্ন নেবে—এই প্রত্যাশায় স্কুলকে টেনিস কোট করে দিলেন, খেলার মাঠের সংস্কার করে দিলেন। স্কুলের শিক্ষকদের খুশি করার জন্য নানা উপায় ঠাওরালেন। বিশেষ করে যা করলেন, তা হলো: শিক্ষকদের প্রায়ই নিমন্ত্রণ করতে আরম্ভ করলেন নিজের বাড়িতে। এ ছাড়া স্কুলের পরামর্শ অনুযায়ী স্ত্রী শামীম ইয়ামীন মেয়েকে বাড়িতে লেখাপড়ায় সাহায্য করতে আরম্ভ করলেন। মেয়েটির ডাকনাম অর্পিতা, আর পোশাকি নাম সাবিরা।
একবার ভাষার বাধা অতিক্রম করার পর অর্পিতা দ্রুত লেখাপড়া শিখতে আরম্ভ করল। সাড়ে চার বছর পর কৃতিত্বের সঙ্গে সে প্রাথমিক স্কুলের লেখাপড়া শেষ করল। মা-বাবা নিজেদের সাফল্যে খুশি হলেন, তার চেয়েও আশান্বিত হলেন মেয়ের ভবিষ্যতের কথা ভেবে। কিন্তু কাকফিল্ডে সেকেন্ডারি স্কুল নেই, আছে সেখান থেকে মাইল পঞ্চাশেক দূরে নিউবেরিতে মেরি হেয়ার স্কুল। লেখাপড়া চালিয়ে যেতে হলে তাই এরপর অর্পিতাকে যেতে হবে মাধ্যমিক স্কুলে। মা-বাবা সে কথা ভেবে কাকফিল্ডের আবাস গুটিয়ে নতুন বাড়ি কিনে নিউবেরিতে বাসা বাঁধলেন।
নতুন স্কুলেও লেখাপড়া চলতে থাকল পুরোদমে। প্রাইমারির তুলনায় এখানে লেখাপড়ার চাপ অনেক বেশি, লেখাপড়ার ধরনও খানিকটা আলাদা। শ্রেণীকক্ষে শেখার বিষয় বেশি, হোমওয়ার্কও বেশি। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো: বুঝে শেখার মতো অনেক বিষয় থাকে। বাবা তাই তাকে বুঝিয়ে দেওয়ার জন্য একজন হেলপার রাখলেন। আর বাড়িতে বুঝিয়ে দেওয়ার জন্য থাকলেন মা। এখানেও মা-বাবা স্কুলের শিক্ষকদের খুশি করার যদ্দুর সম্ভব চেষ্টা করলেন। তাঁদের আন্তরিক আপ্যায়নে শিক্ষকেরা ধীরে ধীরে তাঁদের আপন হয়ে উঠলেন।
কম্পিউটিং, আর্টস, অঙ্ক ও বিজ্ঞানে অর্পিতা খুব ভালো করতে থাকল। বিশেষ করে, বায়োলজিতে। ছবি আঁকায় সে এমন নৈপুণ্য আর সৃজনশীলতা দেখাল যে একবার তার আঁকা একটি ছবি দিয়ে স্কুল বড়দিন উপলক্ষে বিক্রির জন্য একটি ক্রিসমাস কার্ড ছাপিয়ে আনল। অন্যান্য বিষয়েও সে তার আগ্রহ এবং দক্ষতা দেখাতে শুরু করল। কিন্তু তার প্রধান সমস্যা হলো: নিজের কথা অন্যদের সে যথেষ্ট বোঝাতে পারে না; অন্যদের কথাও সে বুঝতে পারে না। এ নিয়ে সে ভারী বিরক্ত আর হতাশ। একেক সময়ে সে রাগে পাগলামো শুরু করে। মা-বাবাকে টেলিফোনে কথা বলতে দেখে টেলিফোনের তার কেটে দেয় রাগ করে। তাঁরা কেবল কথা বলবেন, হাসবেন—তা কেন? এটা তো অবিচার! তার আচরণে মা-বাবা বিরক্ত হন বটে, কিন্তু মেয়ের দুঃখ তাঁরা উপলব্ধি করতে পারেন। টেলিফোন করা তাঁরা বন্ধ করতে পারলেন না, কিন্তু গান শোনা বন্ধ করলেন। গাড়ির রেডিও-ক্যাসেট বাজানো বন্ধ করলেন একেবারে।
বাড়িতে অন্যদের নিমন্ত্রণ করেন, যাতে তাঁদের সঙ্গে অর্পিতা কথা বলতে চেষ্টা করে; আবার তাঁরাও তার সঙ্গে কথা বলেন। যোগাযোগ-প্রক্রিয়া যাতে আরও ভালো বুঝতে পারে—সেটাই তাঁদের উদ্দেশ্য। তার স্কুলের বন্ধুদের তাঁরা নিমন্ত্রণ করেন। তারা এলে সমাদর করেন। অর্পিতা কথা বলতে প্রাণপণ চেষ্টা করে। তার এই চেষ্টার জন্য সে একবার নয়, তিনবার স্কুলের বার্ষিক পুরস্কার লাভ করেছিল। তা সত্ত্বেও তার কথা অন্যরাও ভালো বুঝতে পারে না। সে কথা বলে, কিন্তু অন্যদের কথা শুনতে পায় না বলে সঠিক উচ্চারণে নিজে কথা বলতে পারে না, যদিও অন্যদের কথা সে অনেকটাই বুঝতে পারে তাদের ঠোঁট আর জিব নাড়ানো এবং মুখভঙ্গি থেকে। সমস্ত পৃথিবীটা অর্পিতার কাছে নীরব-নিঝুম। এভাবেই সে বড় হতে থাকল। কিন্তু অত্যন্ত মেধাবী বলে লেখাপড়া সে শিখতে থাকল ঠিকমতো।
মাধ্যমিক স্কুলের শেষ পরীক্ষা—জিসিএসইতে সে উত্তীর্ণ হলো খুবই কৃতিত্বের সঙ্গে। তিনটা বিষয়ে সে পেয়েছিল এ স্টার; দুটোতে এ, আর দুটোতে সি। মা-বাবা আনন্দে উচ্ছ্বসিত হন। মেয়ের সাফল্যকে তাঁরা নিজেদের সাফল্য বলেই গণ্য করেন—আর সত্যিই তো তাঁদেরও অসাধারণ প্রয়াসের সাফল্য সেটা। কিন্তু এখানেই কি তাঁরা ইতি টানবেন অর্পিতার শিক্ষার? না, সে রকম সিদ্ধান্ত তাঁরা নিলেন না। তাঁরা মেয়েকে আরও সামনে এগিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন। অর্পিতা ‘এ-লেভেল’ করতে আরম্ভ করল। কম্পিউটিং আর আর্টে সে সাফল্য দেখিয়েছিল অনেক, কিন্তু ওই দুটি বিষয় সে নিল না। অথচ নিলে কাজটা তার জন্য সহজ হতো। সে জোর দিল বিজ্ঞানের দিকে। হেলপার, শিক্ষকেরা আর বাড়িতে মায়ের যত্নে সে ‘এ-লেভেল’ পরীক্ষাও কৃতিত্বের সঙ্গে পাস করল।
স্কুলের পালা শেষ। ইংল্যান্ডের বেশির ভাগ ছাত্রছাত্রী এখানেই তাদের লেখাপড়া শেষ করে। অর্পিতাও এ পর্যায়ে তার লেখাপড়া শেষ করতে পারত। কিন্তু তার মা-বাবার উৎসাহ এবং উচ্চাশা গেল আরও বেড়ে। মেয়ে যখন সাফল্য দেখাচ্ছে, তখন আরও এগিয়ে যেতে হবে। নিউবেরির আবাস গুটিয়ে তাঁরা এবার এসে আস্তানা গাড়লেন অক্সফোর্ডে। সেখানে অর্পিতা ভর্তি হলো ব্রুকস বিশ্ববিদ্যালয়ে। মেয়ের লেখাপড়ায় সাহায্যের জন্য সেখানেও নিয়োগ করলেন হেলপার। যথাসময়ে অর্পিতা বায়োলজিতে প্রথমে অনার্স ডিগ্রি করল চার বছরে। তারপর আরও এক বছর লেখাপড়া করে সে বায়ো-ইমেজিংয়ে এমএসসি শেষ করল কৃতিত্বের সঙ্গে। যেদিন সে এমএসসি পাস করল, সেদিন তার বাবা আমাকে ফোন করে কেবল খবরটা দেননি, সেই সঙ্গে নিজের কথা বলেছিলেন—তিনি ‘ওভার দ্য মুন’। অর্থাৎ, আনন্দে আত্মহারা তিনি। আত্মহারা হওয়ারই কথা। কারণ, তাঁদের ১৫ বছরের কঠিন সাধনায় তাঁরা সফল হয়েছেন। মেয়ের শ্রবণ-প্রতিবন্ধিতা তাঁরা ভালো করতে পারবেন না; কিন্তু তাকে অন্তত আর পাঁচজনের মতো কেন, তার চেয়েও বেশি শিক্ষা দিতে পেরেছেন। অতঃপর অর্পিতার মা-বাবা ভাবতে আরম্ভ করলেন, ১৫-১৬ বছর পর অবশেষে দেশে ফিরে যাওয়ার কথা।
অর্পিতা অবশ্য দেশে ফিরে যেতে চায় না। কারণ সে লক্ষ করেছে, ইংল্যান্ডে প্রতিবন্ধীদের আর পাঁচজন লোকের মতোই মনে করা হয়। বরং তাদের বেশি খাতির করা হয় তাদের প্রতিবন্ধিতার জন্য। সম্মান করা হয় সবার মতো। অন্যদিকে, বাংলাদেশে প্রতিবন্ধীদের অবহেলা করা হয়। অনেকে ব্যবহার করে অস্পৃশ্যদের মতো। আত্মীয়স্বজনও তার সঙ্গে স্বাভাবিক ব্যবহার করে না। এড়িয়ে চলে তাকে। কাজেই সে বাংলাদেশে ফিরে যেতে আগ্রহী নয়। সে বরং ইতিমধ্যে চাকরির জন্য আবেদন করে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে। সে চাকরি পেল প্রথম চেষ্টাতেই।
সে তো পড়ানোর কাজ পাবে না! কিন্তু চাকরি পেল গবেষণাগারে—গ্রে ইনস্টিটিউট ফর রেডিয়েশন অ্যান্ড বায়োলজিতে। সেখানে সে গবেষণার কাজ করে তার সহকর্মীদের সঙ্গে। দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে সে কাজ করছে সেই গবেষণাগারে। তার সহকর্মী দলের গবেষণার ভিত্তিতে যে গবেষণাপত্র জার্নালে প্রকাশিত হচ্ছে, তাতে অন্যদের সঙ্গে সাবিরা ইয়ামীনের গবেষণার ফলাফলও থাকছে—যে সাবিরা একেবারে জন্মাবধি পুরোপুরি মূক ও বধির। এ রকমের প্রতিবন্ধিত্ব নিয়ে বাংলাদেশের কোনো ছেলেমেয়ে এমন সাফল্য দেখিয়েছে বলে আমার জানা নেই। অন্য কারও আছে বলেও মনে হয় না। বস্তুত, কেবল বাংলাদেশেই নয়, পৃথিবীর অন্যান্য দেশেও একজন প্রতিবন্ধীর এ রকম সাফল্যের দৃষ্টান্ত খুব কমই দেখা যায়, বিশেষ করে লেখাপড়ার জগতে।
তার সাফল্য দেখে সত্যি সত্যি গর্ববোধ করি। সাফল্য কেবল তার একার নয়—অসামান্য সাফল্য তার মা-বাবারও। তাঁদের জন্যও গর্ববোধ করি। তাঁদের আত্মত্যাগ দেখে বিস্ময়ে মাথা নুয়ে যায়। কিন্তু তার সফল বাবার শেষ কথাটা না বলে পারছি না। মেয়ে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষক হিসেবে কাজ পেয়েছে। দেশে ফিরে যেতে সে চায় না। তাকে জোর করে দেশে নিয়ে যাওয়ার ইচ্ছাও নেই তাঁদের। তাই তার অসাধারণ আত্মত্যাগী পিতা প্রতিষ্ঠিত কন্যাকে অক্সফোর্ডে রেখেই দেশে ফিরে যাবেন বলে চিন্তাভাবনা করতে আরম্ভ করেন। আর সত্যি সত্যি একদিন দেশে ফিরে গেলেন। ভিসা বাড়ানোর জন্য পাসপোর্ট পাঠিয়েছিলেন হোম অফিসে। সাত বছর পর সে পাসপোর্ট ফিরে এল স্থায়ীভাবে ইংল্যান্ডে থাকার ভিসা নিয়ে। এত বছর দেশে ফিরতে পারেননি তিনি পাসপোর্টের অভাবে। যখন ফিরে পেলেন, তত দিনে পাসপোর্টের মেয়াদ ফুরিয়ে গেছে। তাই নতুন পাসপোর্ট করলেন মা-বাবা দুজনই। তারপর গত ডিসেম্বরে দেশে ফিরলেন তিন সপ্তাহের জন্য সাবিরা আর সেবিকা ফাতিমাকে সঙ্গে নিয়ে। মায়ের অসুস্থতার কথা শুনে স্ত্রী এসেছিলেন আগেই।
আসার সময়ে কী ভেবেছিলেন জানি না; কিন্তু দেশ থেকে তাঁর আর ফেরা হলো না। স্নানের ঘরে পড়ে গিয়ে পাঁজর ভেঙে গেল একটি-দুটি নয়, পাঁচটি। সেই সঙ্গে দেখা দিল ফুসফুসের জটিলতা। তা থেকেই গত ২১ জানুয়ারি শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করে স্থায়ীভাবে দেশেই থেকে গেলেন মুহাম্মদ ইয়ামীন। এমনিতে তাঁর স্বাস্থ্য ভালো ছিল। ব্যায়ামও করতেন মাঝেমধ্যে। হাঁটতেন প্রায়ই। দুর্ঘটনা থেকেই তাঁর মৃত্যু। কিন্তু তিনি মারা গেলেও পেছনে রেখে গেলেন তাঁর মূর্তিমান সাফল্য—সাবিরাকে; আর সন্তানের জন্য একজন সংকল্পবদ্ধ বাবা কী অসাধ্য সাধন করতে পারেন, সেই তুলনাহীন দৃষ্টান্ত।
সাবিরা ফিরে এল অক্সফোর্ডে। অনেক সম্ভাবনা তার সামনে। অনেক সাফল্য আছে তার জন্য অপেক্ষা করে।

হেলেন কেলার

উনিশ শতকের রহস্যময়ী ও আশ্চর্য এক নারী হচ্ছেন 'হেলেন কেলার'। বাক-শ্রবণ ও দৃষ্টিপ্রতিবন্ধিত্ব নিয়ে ১৮৮০ সালের ২৭ জুন উত্তর আমেরিকার টুস্কুমরিয়া নামে ছোট শহরে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবার নাম আথার কেলার এবং মায়ের নাম ক্যাথরিন। হেলেন কেলারের বয়স যখন মাত্র দেড় বছর তখন তিনি গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন। বাবা-মা প্রাণের প্রিয় কন্যার জীবনের আশা-ভরসা ছেড়ে দিলেও ভেঙে পড়েননি। চিকিৎসা করা শুরু করেন। তৎকালীন আমেরিকা পৃথিবীর একটি উন্নত দেশ হলেও আজকের মতো চ্যালেঞ্জিং চিকিৎসা ব্যবস্থা ছিল না। বহু চিকিৎসার পর জীবন রক্ষা পায়। কিন্তু ভাগ্যের কী নির্মম পরিহাস_ কথা বলা, শোনা এবং দেখার শক্তি চিরদিনের জন্য হারিয়ে যায়। অন্ধকার, আলোহীন আর নিস্তব্ধে ছেয়ে যায় মায়ার জীবন ও জগৎ।
ফলে শিশুকালেই হেলেন কেলার একাধারে বাক-শ্রবণ ও দৃষ্টিপ্রতিবন্ধিত্বের শিকার হয়ে বহুমুখী প্রতিবন্ধিত্ব নিয়েই বড় হতে থাকে। তার বয়স যখন মাত্র ছয় বছর তখন বাবা-মা তাকে ওয়াশিংটনের এক প্রসিদ্ধ বিজ্ঞানী, টেলিফোন আবিষ্কারক ডা. আলেকজান্ডার গ্রাহাম বেলের কাছে পরামর্শ গ্রহণের জন্য নিয়ে যান। কারণ আলেকজান্ডার গ্রাহাম বেল দীর্ঘদিন ধরে বাক-শ্রবণপ্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের উন্নয়নের লক্ষ্যে নিরলসভাবে কাজ করছিলেন। তিনি হেলেন কেলারকে প্রাথমিকভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে বলেন, হেলেন আর কোনো দিন চোখে দেখতে পাবে না এবং কানেও শুনতে পাবে না। তবুও হতাশ হওয়ার কিছু নেই। কারণ হেলেন কেলারের বুদ্ধিমত্তা তীক্ষ্ন। সেজন্য গুরুত্বের সঙ্গে পরিকল্পনা অনুযায়ী শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হলে স্বাভাবিক জীবনের কাছাকাছি একটি সুন্দর জীবন ফিরে পেতে পারে।
পরিবারের উৎকণ্ঠা ও হতাশা কিছুটা হলেও কমে যায়। এরপর শুরু হয় শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ। মাত্র আট বছর বয়সেই হেলেন কেলার হাতে আঙুল দিয়ে দাগ কেটে কেটে লেখা, ব্রেইল পদ্ধতিতে লেখাপড়াসহ শব্দ ও বাক্য উচ্চারণ পর্যন্ত শিখে ফেলেন। এতে পরিবারের লোকজন ও আত্মীয়স্বজন অবাক হয়ে যান। সবচেয়ে আশ্চর্য বিষয় ছিল তার কথা শেখা। চোখে না দেখা ও কানে না শোনার দরুন প্রথমে একটি শব্দ ব্রেইলের মাধ্যমে জানতো। শিক্ষকের মুখের কম্পন, ঠোঁট ও জিহ্বার নড়াচড়া হাত দিয়ে অনুভব করে তা বোঝা ও অনুসরণ করার চেষ্টা করতো। প্রথম প্রথম যেসব শব্দ বলতো তা অদ্ভুত ধরনের বিকট শব্দের মতো উচ্চারিত হতো। তবুও নিরলস সাধনা করে অসাধ্যকেও সাধন করেছে, অসম্ভবকে সম্ভব করেছে।
১৪ বছর বয়সে হেলেন আমেরিকার নিউইয়র্কের 'রাইট হুমাসন' নামক একটি স্কুলে ভর্তি হন। এখানে বিশ্ববিখ্যাত লেখক মার্ক টোয়েনের সঙ্গে তার পরিচয় ঘটে। স্কুল ফাইনাল পাস করার আগেই তার পিতা দুনিয়ার মায়া ত্যাগ করেন। ১৯০৪ সালে হেলেন র‌্যাডক্লিফ কলেজ থেকে গ্র্যাজুয়েশন ডিগ্রি লাভ করেন।
এরপর নিজের প্রতিবন্ধিত্বের কথা উপলব্ধি করে তিনি সমাজের বাক-শ্রবণ ও দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী মানুষের জন্য সামাজিক সচেতনতা সৃষ্টি ও গণমানুষের সহায়তা অর্জনে দেশের এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্ত পর্যন্ত হাজার হাজার মানুষের সমাবেশে বক্তব্য রাখেন। হেলেন কেলার পরে দেশের বিভিন্ন স্থানে বাক-শ্রবণ ও দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের উন্নয়নে নতুন নতুন স্কুল এবং সমিতি গড়ে তোলেন।
১৯১৩ সালে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ছাত্রছাত্রীদের লেখাপড়ার জন্য আমেরিকার জাতীয় লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠিত হয়। যদিও তিনি সম্পূর্ণ দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ছিলেন কিন্তু তিনি দৃষ্টিসম্পন্ন বহু জ্ঞানী লোকের চেয়েও অধিক বেশি বই পড়েছেন। শুধু বই পড়েননি, বইও লিখেছেন। তার রচিত বইয়ের সংখ্যা ১১ খানা। প্রধান বই হচ্ছে দি স্টোরি অফ মাই লাইফ, লেট আস হ্যাভ কেইথ, দি ওয়ার্ল্ড আই লিভ ইন, ওপেন ডোর ইত্যাদি। এছাড়াও তিনি বাক-শ্রবণ ও দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অভিশপ্ত বিড়ম্বনা জীবনের বিষাদের ওপর একটি চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন। চলচ্চিত্রে তার নিজের ভূমিকায় তিনি নিজেই অভিনয় করেছেন। তার জীবনের শেষ নেই। এই মহীয়সী নারীর জীবনের দিকে লক্ষ্য করলে মনে হয় পৃথিবীতে আশ্চর্য বলতে সত্যি কিছু নেই। তিনি বাক-শ্রবণ ও দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী নারী ছিলেন অথচ স্বাভাবিক মানুষের চেয়ে বেশি সঙ্গীত উপভোগ করতে পারতেন। তার সঙ্গীত উপভোগ করার আশ্চর্য পদ্ধতি ছিল। তিনি বাদ্যযন্ত্রের ওপর হাত রেখেই বলে দিতে পারতেন তাতে কী ধরনের সুর বাজছে। হাতের স্পর্শ দিয়ে তিনি শ্রবণের কাজ করতেন আশ্চর্য বুদ্ধিমত্তা দ্বারা। গায়ক-গায়িকার কণ্ঠে হাত দিয়ে অনায়াসে বলতে পারতেন কি সঙ্গীত গাইছে। তার এমন আশ্চর্য ক্ষমতা ছিল যে, বহু দিনের পরিচিত মানুষের সঙ্গে করমর্দন করে বলে দিতে পারতেন তার পরিচয়। দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী হয়েও তিনি নৌকা চালাতে পারতেন।
তিনি দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী হয়েও নদীতে সাঁতার কাটতে পারতেন, নৌকা বাইতে পারতেন, দাবা ও তাস খেলতে পারতেন। ঘরে বসে নকশিকাঁথা সেলাই করতে পারতেন।
১৯৪১ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট রুজভেল্টের অনুরোধে হেলেন কেলার বিভিন্ন হাসপাতালে যুদ্ধাহত দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী নাবিক ও সৈনিকদের দেখতে যেতেন এবং শান্তি ও আশার বাণী শোনাতেন।
যুদ্ধ শেষ হলে বাক-শ্রবণ ও দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য বিশ্বব্যাপী এক আন্দোলন গড়ে তোলার প্রয়াস পান। ১৯৫৯ সালে হেলেন কেলার জাতিসংঘ কর্তৃক বিশেষ সম্মানে ভূষিত হন। ১৯৬৮ সালের ১ জুন হৃদয়ের আলোতে আলোকিত এই মহীয়সী প্রতিবন্ধী নারী দুনিয়ার মায়া ছেড়ে স্বর্গে চলে যান।
বিশ্বব্যাপী বাক-শ্রবণ ও দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী নারীর স্মৃতিকে চির অমস্নান করে রাখার জন্য এবং অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৭৭ সালে 'আমেরিকান অ্যাসোসিয়েশন ফর দি ওভারসিজ বাইন্ড' গঠন করা হয়েছে। পরে নাম পরিবর্তন করে 'হেলেন কেলার ইন্টারন্যাশনাল' করা হয়েছে।

সম্মান করা হয় সবার মতো





সমস্ত পৃথিবীটাই সাবিরার কাছে নীরব-নিঝুম ছোটবেলা থেকেই সাবিরা শুনতে পান না বলতে পারেন না কথা মেয়ের পড়ালেখা হবে কি না এই ভেবে মহা দুশ্চিন্তায় পড়েছিলেন মা-বাবা সেই সাবিরাই শেষতক কীভাবে পৌঁছে গেলেন বিশ্বের অন্যতম সেরা বিদ্যাপীঠ অক্সফোর্ড অবধি? বনে গেলেন অক্সফোর্ডের গবেষক?
মেয়েটির জন্ম হয়েছিল তার যখন জন্ম হওয়ার কথা, তার দুই মাস আগেই ১৯৮৪ সালের জুলাই মাসে মা-বাবা দুজনই তাই অত্যন্ত উৎকণ্ঠিত ছিলেন জন্মের পর মা তাকিয়ে দেখেছিলেন সদ্যভূমিষ্ঠ সন্তানটিকে দেখলেন, ভারি সুন্দর চিৎকার করে কাঁদছে খুশি হলেন মা-বাবা দুজনই তবে সন্তানটি বাঁচবে কি না, তা নিয়ে আশঙ্কা করলেন নামকরা ডাক্তার, দেখাশোনা করছিলেনএই যা ভরসা কিন্তু সন্তানটি জন্ম নেওয়ার এক সপ্তাহ পরই তার জটিল সমস্যা দেখা দিলনিউমোনিয়া হলো তাকে বাঁচানো যাবে কি না, সেটাই আশঙ্কার কারণ হয়ে দেখা দিল ডাক্তার তাকে একটি অ্যান্টিবায়োটিক দিলেন ইনজেকশনের মাধ্যমে বহু চিকিৎসা আর পরিচর্যার পর সে বেঁচে গেল তার পরও চলল অব্যাহত যত্ন নেওয়ার পালা কয়েক মাস বয়সের পর সে বড় হতে থাকল ধীরে ধীরেঅন্য সব সন্তানের মতো ফুটফুটে মেয়েটির হাসি দেখে তার আত্মীয়স্বজন সবাই খুশি

মুশকিল দেখা দিল মেয়েটির বয়স যখন দেড়-দুই বছর, তখন থেকে দেখা গেল, মেয়েটি অন্যদের কথায় কোনো রকম সাড়াই দিচ্ছে না সবাই আশঙ্কা করতে আরম্ভ করল যে সে হয়তো শুনতেই পাচ্ছে না! ভালো ডাক্তাররা দেখলেন তাকে, কিন্তু বিশেষ আশ্বাস দিতে পারলেন না আরও কয়েক মাস বয়স বাড়ার পর মা-বাবা যখন নিশ্চিত হলেন সে শুনতে পাচ্ছে না, তখনই শুরু হলো বড় ডাক্তারদের চিকিৎসা কানের বিশেষজ্ঞ দেখানো হলো ভারত, সিঙ্গাপুর, ইংল্যান্ড, আমেরিকাসহ নানা জায়গায় একজন-দুজন নয়, অনেক ডাক্তার তাঁরা রায় দিলেন, মেয়েটি শুনতে পায় না অর্থাৎ, সে শ্রবণপ্রতিবন্ধী, বধির চিকিৎসায় তেমন কোনো কাজ হবে না, তাও বললেন কেউ বা বললেন, ধীরে ধীরে খানিকটা উন্নতি হতে পারে চিকিৎসার সঙ্গে সঙ্গে অধীর আগ্রহে মা-বাবা উদ্গ্রীব হয়ে থাকলেন, কিন্তু সে কানে শুনতে পেল না কয়েক বছর অপেক্ষা করেও না

মা-বাবা তখন সন্তানটির ভবিষ্যৎ নিয়ে দারুণ দুর্ভাবনায় পড়লেন তাঁদের অন্য তিন সন্তানই লেখাপড়ায় খুব ভালো কিন্তু সন্তানটি লেখাপড়া শিখতে পারবে নাএটা ভেবে তাঁরা হতাশায় ভেঙে পড়েন! অমন সুন্দর মেয়েটি কথা বলতে পারবে না কোনো দিন! অন্যদের সঙ্গে সত্যিকার যোগাযোগ করতে পারবে না! মেয়ের ভবিষ্যতের কথা ভেবে তাঁরা চোখে অন্ধকার দেখেন বাবা বড় ব্যবসায়ী, দেশ-বিদেশে ব্যবসা রীতিমতো ধনী কিন্তু তিনি দেখলেন, এই ধনসম্পত্তি সবই হয়ে যাবে অর্থহীন তার থেকেও দুঃখের কথা: মেয়েটির জীবন হয়ে যাবে একেবারে অর্থহীন বিদেশ থেকে ডাক্তার নিয়ে এলেন তিনি ঢাকার শিশু হাসপাতালের অডিও বিভাগের একজন কি দুজন ডাক্তার আর নার্সদের ভারত থেকে প্রশিক্ষণ দিয়ে আনালেন (এই হাসপাতালের অডিও বিভাগের একটি উইংয়ের নাম তার বাবা তারই নামে করে দিয়েছেন) কিন্তু সব চেষ্টা ব্যর্থ হলো

অতঃপর কঠিন সিদ্ধান্ত নেওয়ার পালা একদিকে মেয়েটির ভবিষ্যৎ; অন্যদিকে নিজের পরিবার, সামাজিক সম্পর্ক, যোগাযোগ, ব্যবসা-বাণিজ্য, নিজেদের এবং অন্য সন্তানদের জীবন আর ভবিষ্যৎ কিন্তু না, বাবা মুহাম্মদ ইয়ামীন অগত্যা অত্যন্ত দুরূহ সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললেন তিনি ঠিক করলেন, সবকিছু ছেড়ে দিয়ে মেয়েকে নিয়ে থাকবেন এমন একটা দেশে, যেখানে মেয়েকে ঠিকমতো লেখাপড়া শেখানো সম্ভব হবে ইংল্যান্ড থেকে যে শ্রবণ-বিশেষজ্ঞ চিকিৎসককে নিয়ে এসেছিলেন বাংলাদেশে, তিনি বুদ্ধি দিলেন ইংল্যান্ডে নিয়ে যেতে স্কুলের সঙ্গে যোগাযোগও করিয়ে দিয়েছিলেন তিনি ভর্তির ব্যবস্থা পাকাপাকি হলো

তারপর বধির সন্তান, স্ত্রী আর একজন সেবিকাফাতেমাকে নিয়ে ১৯৯২ সালের ১০ জানুয়ারি মুহাম্মদ ইয়ামীন চলে এলেন ইংল্যান্ডের দক্ষিণ উপকূলের সুন্দর শহর ব্রাইটনে ঘর বাঁধলেন শহরের কয়েক মাইল দূরে কাকফিল্ডে সেখানে আছে মূক-বধিরদের স্কুল ব্রাইটন ইনস্টিটিউশন ফর দি ইনস্ট্রাকশন অব দ্য ডেফ অ্যান্ড ডাম্ব নামে ব্রাইটনের বধির বিদ্যালয় স্থাপিত হয়েছিল ১৮৪১ সালে শ্রবণ-প্রতিবন্ধীদের শিক্ষা দেওয়ার দীর্ঘ ঐতিহ্য রয়েছে ব্রাইটনেরকাকফিল্ডে যে বধির বিদ্যালয়, তার নাম মিল হল অরাল স্কুল ফর দ্য ডেফ সেখানেই শুরু হলো মেয়েটির একেবারে প্রাথমিক লেখাপড়া স্বভাবতই স্কুলে শিক্ষা এবং যোগাযোগের মাধ্যম ইংরেজি এবং সেটাই মেয়েটির জন্য সবচেয়ে বড় সমস্যা হিসেবে দেখা দিল কিন্তু ধীরে ধীরে মেয়েটি ইংরেজি বর্ণ চিনল, সংখ্যা শিখল শব্দ, বাক্য এবং অঙ্কও তারপর ইংরেজি পড়তে লিখতে শিখল স্কুল থেকে বলা হলো মেয়েটির সঙ্গে সারাক্ষণ কথা বলতে ঠোঁট, মুখ আর জিবের অবস্থান দিয়ে সে যাতে বুঝতে পারে কী বলছে অন্যরা; আর সেটা অনুকরণ করে যাতে সে কথা বলতে চেষ্টা করে

মেয়েকে যদ্দুর সম্ভব ভালো শিক্ষাদানের জন্য মুহাম্মদ ইয়ামীন চেষ্টার কোনো ত্রুটি করেননি স্কুল মেয়ের খুব ভালো যত্ন নেবেএই প্রত্যাশায় স্কুলকে টেনিস কোট করে দিলেন, খেলার মাঠের সংস্কার করে দিলেন স্কুলের শিক্ষকদের খুশি করার জন্য নানা উপায় ঠাওরালেন বিশেষ করে যা করলেন, তা হলো: শিক্ষকদের প্রায়ই নিমন্ত্রণ করতে আরম্ভ করলেন নিজের বাড়িতে ছাড়া স্কুলের পরামর্শ অনুযায়ী স্ত্রী শামীম ইয়ামীন মেয়েকে বাড়িতে লেখাপড়ায় সাহায্য করতে আরম্ভ করলেন মেয়েটির ডাকনাম অর্পিতা, আর পোশাকি নাম সাবিরা

একবার ভাষার বাধা অতিক্রম করার পর অর্পিতা দ্রুত লেখাপড়া শিখতে আরম্ভ করল সাড়ে চার বছর পর কৃতিত্বের সঙ্গে সে প্রাথমিক স্কুলের লেখাপড়া শেষ করল মা-বাবা নিজেদের সাফল্যে খুশি হলেন, তার চেয়েও আশান্বিত হলেন মেয়ের ভবিষ্যতের কথা ভেবে কিন্তু কাকফিল্ডে সেকেন্ডারি স্কুল নেই, আছে সেখান থেকে মাইল পঞ্চাশেক দূরে নিউবেরিতে মেরি হেয়ার স্কুল লেখাপড়া চালিয়ে যেতে হলে তাই এরপর অর্পিতাকে যেতে হবে মাধ্যমিক স্কুলে মা-বাবা সে কথা ভেবে কাকফিল্ডের আবাস গুটিয়ে নতুন বাড়ি কিনে নিউবেরিতে বাসা বাঁধলেন
নতুন স্কুলেও লেখাপড়া চলতে থাকল পুরোদমে প্রাইমারির তুলনায় এখানে লেখাপড়ার চাপ অনেক বেশি, লেখাপড়ার ধরনও খানিকটা আলাদা শ্রেণীকক্ষে শেখার বিষয় বেশি, হোমওয়ার্কও বেশি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো: বুঝে শেখার মতো অনেক বিষয় থাকে বাবা তাই তাকে বুঝিয়ে দেওয়ার জন্য একজন হেলপার রাখলেন আর বাড়িতে বুঝিয়ে দেওয়ার জন্য থাকলেন মা এখানেও মা-বাবা স্কুলের শিক্ষকদের খুশি করার যদ্দুর সম্ভব চেষ্টা করলেন তাঁদের আন্তরিক আপ্যায়নে শিক্ষকেরা ধীরে ধীরে তাঁদের আপন হয়ে উঠলেন

কম্পিউটিং, আর্টস, অঙ্ক বিজ্ঞানে অর্পিতা খুব ভালো করতে থাকল বিশেষ করে, বায়োলজিতে ছবি আঁকায় সে এমন নৈপুণ্য আর সৃজনশীলতা দেখাল যে একবার তার আঁকা একটি ছবি দিয়ে স্কুল বড়দিন উপলক্ষে বিক্রির জন্য একটি ক্রিসমাস কার্ড ছাপিয়ে আনল অন্যান্য বিষয়েও সে তার আগ্রহ এবং দক্ষতা দেখাতে শুরু করল কিন্তু তার প্রধান সমস্যা হলো: নিজের কথা অন্যদের সে যথেষ্ট বোঝাতে পারে না; অন্যদের কথাও সে বুঝতে পারে না নিয়ে সে ভারী বিরক্ত আর হতাশ একেক সময়ে সে রাগে পাগলামো শুরু করে মা-বাবাকে টেলিফোনে কথা বলতে দেখে টেলিফোনের তার কেটে দেয় রাগ করে তাঁরা কেবল কথা বলবেন, হাসবেনতা কেন? এটা তো অবিচার! তার আচরণে মা-বাবা বিরক্ত হন বটে, কিন্তু মেয়ের দুঃখ তাঁরা উপলব্ধি করতে পারেন টেলিফোন করা তাঁরা বন্ধ করতে পারলেন না, কিন্তু গান শোনা বন্ধ করলেন গাড়ির রেডিও-ক্যাসেট বাজানো বন্ধ করলেন একেবারে
বাড়িতে অন্যদের নিমন্ত্রণ করেন, যাতে তাঁদের সঙ্গে অর্পিতা কথা বলতে চেষ্টা করে; আবার তাঁরাও তার সঙ্গে কথা বলেন যোগাযোগ-প্রক্রিয়া যাতে আরও ভালো বুঝতে পারেসেটাই তাঁদের উদ্দেশ্য তার স্কুলের বন্ধুদের তাঁরা নিমন্ত্রণ করেন তারা এলে সমাদর করেন অর্পিতা কথা বলতে প্রাণপণ চেষ্টা করে তার এই চেষ্টার জন্য সে একবার নয়, তিনবার স্কুলের বার্ষিক পুরস্কার লাভ করেছিল তা সত্ত্বেও তার কথা অন্যরাও ভালো বুঝতে পারে না সে কথা বলে, কিন্তু অন্যদের কথা শুনতে পায় না বলে সঠিক উচ্চারণে নিজে কথা বলতে পারে না, যদিও অন্যদের কথা সে অনেকটাই বুঝতে পারে তাদের ঠোঁট আর জিব নাড়ানো এবং মুখভঙ্গি থেকে সমস্ত পৃথিবীটা অর্পিতার কাছে নীরব-নিঝুম এভাবেই সে বড় হতে থাকল কিন্তু অত্যন্ত মেধাবী বলে লেখাপড়া সে শিখতে থাকল ঠিকমতো

মাধ্যমিক স্কুলের শেষ পরীক্ষাজিসিএসইতে সে উত্তীর্ণ হলো খুবই কৃতিত্বের সঙ্গে তিনটা বিষয়ে সে পেয়েছিল স্টার; দুটোতে , আর দুটোতে সি মা-বাবা আনন্দে উচ্ছ্বসিত হন মেয়ের সাফল্যকে তাঁরা নিজেদের সাফল্য বলেই গণ্য করেনআর সত্যিই তো তাঁদেরও অসাধারণ প্রয়াসের সাফল্য সেটা কিন্তু এখানেই কি তাঁরা ইতি টানবেন অর্পিতার শিক্ষার? না, সে রকম সিদ্ধান্ত তাঁরা নিলেন না তাঁরা মেয়েকে আরও সামনে এগিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন অর্পিতা-লেভেলকরতে আরম্ভ করল কম্পিউটিং আর আর্টে সে সাফল্য দেখিয়েছিল অনেক, কিন্তু ওই দুটি বিষয় সে নিল না অথচ নিলে কাজটা তার জন্য সহজ হতো সে জোর দিল বিজ্ঞানের দিকে হেলপার, শিক্ষকেরা আর বাড়িতে মায়ের যত্নে সে-লেভেলপরীক্ষাও কৃতিত্বের সঙ্গে পাস করল

স্কুলের পালা শেষ ইংল্যান্ডের বেশির ভাগ ছাত্রছাত্রী এখানেই তাদের লেখাপড়া শেষ করে অর্পিতাও পর্যায়ে তার লেখাপড়া শেষ করতে পারত কিন্তু তার মা-বাবার উৎসাহ এবং উচ্চাশা গেল আরও বেড়ে মেয়ে যখন সাফল্য দেখাচ্ছে, তখন আরও এগিয়ে যেতে হবে নিউবেরির আবাস গুটিয়ে তাঁরা এবার এসে আস্তানা গাড়লেন অক্সফোর্ডে সেখানে অর্পিতা ভর্তি হলো ব্রুকস বিশ্ববিদ্যালয়ে মেয়ের লেখাপড়ায় সাহায্যের জন্য সেখানেও নিয়োগ করলেন হেলপার যথাসময়ে অর্পিতা বায়োলজিতে প্রথমে অনার্স ডিগ্রি করল চার বছরে তারপর আরও এক বছর লেখাপড়া করে সে বায়ো-ইমেজিংয়ে এমএসসি শেষ করল কৃতিত্বের সঙ্গে যেদিন সে এমএসসি পাস করল, সেদিন তার বাবা আমাকে ফোন করে কেবল খবরটা দেননি, সেই সঙ্গে নিজের কথা বলেছিলেনতিনিওভার দ্য মুন অর্থাৎ, আনন্দে আত্মহারা তিনি আত্মহারা হওয়ারই কথা কারণ, তাঁদের ১৫ বছরের কঠিন সাধনায় তাঁরা সফল হয়েছেন মেয়ের শ্রবণ-প্রতিবন্ধিতা তাঁরা ভালো করতে পারবেন না; কিন্তু তাকে অন্তত আর পাঁচজনের মতো কেন, তার চেয়েও বেশি শিক্ষা দিতে পেরেছেন অতঃপর অর্পিতার মা-বাবা ভাবতে আরম্ভ করলেন, ১৫-১৬ বছর পর অবশেষে দেশে ফিরে যাওয়ার কথা
অর্পিতা অবশ্য দেশে ফিরে যেতে চায় না কারণ সে লক্ষ করেছে, ইংল্যান্ডে প্রতিবন্ধীদের আর পাঁচজন লোকের মতোই মনে করা হয় বরং তাদের বেশি খাতির করা হয় তাদের প্রতিবন্ধিতার জন্য অন্যদিকে, বাংলাদেশে প্রতিবন্ধীদের অবহেলা করা হয় অনেকে ব্যবহার করে অস্পৃশ্যদের মতো আত্মীয়স্বজনও তার সঙ্গে স্বাভাবিক ব্যবহার করে না এড়িয়ে চলে তাকে কাজেই সে বাংলাদেশে ফিরে যেতে আগ্রহী নয় সে বরং ইতিমধ্যে চাকরির জন্য আবেদন করে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে সে চাকরি পেল প্রথম চেষ্টাতেই

সে তো পড়ানোর কাজ পাবে না! কিন্তু চাকরি পেল গবেষণাগারেগ্রে ইনস্টিটিউট ফর রেডিয়েশন অ্যান্ড বায়োলজিতে সেখানে সে গবেষণার কাজ করে তার সহকর্মীদের সঙ্গে দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে সে কাজ করছে সেই গবেষণাগারে তার সহকর্মী দলের গবেষণার ভিত্তিতে যে গবেষণাপত্র জার্নালে প্রকাশিত হচ্ছে, তাতে অন্যদের সঙ্গে সাবিরা ইয়ামীনের গবেষণার ফলাফলও থাকছেযে সাবিরা একেবারে জন্মাবধি পুরোপুরি মূক বধির রকমের প্রতিবন্ধিত্ব নিয়ে বাংলাদেশের কোনো ছেলেমেয়ে এমন সাফল্য দেখিয়েছে বলে আমার জানা নেই অন্য কারও আছে বলেও মনে হয় না বস্তুত, কেবল বাংলাদেশেই নয়, পৃথিবীর অন্যান্য দেশেও একজন প্রতিবন্ধীর রকম সাফল্যের দৃষ্টান্ত খুব কমই দেখা যায়, বিশেষ করে লেখাপড়ার জগতে
তার সাফল্য দেখে সত্যি সত্যি গর্ববোধ করি সাফল্য কেবল তার একার নয়অসামান্য সাফল্য তার মা-বাবারও তাঁদের জন্যও গর্ববোধ করি তাঁদের আত্মত্যাগ দেখে বিস্ময়ে মাথা নুয়ে যায় কিন্তু তার সফল বাবার শেষ কথাটা না বলে পারছি না মেয়ে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষক হিসেবে কাজ পেয়েছে দেশে ফিরে যেতে সে চায় না তাকে জোর করে দেশে নিয়ে যাওয়ার ইচ্ছাও নেই তাঁদের তাই তার অসাধারণ আত্মত্যাগী পিতা প্রতিষ্ঠিত কন্যাকে অক্সফোর্ডে রেখেই দেশে ফিরে যাবেন বলে চিন্তাভাবনা করতে আরম্ভ করেন আর সত্যি সত্যি একদিন দেশে ফিরে গেলেন ভিসা বাড়ানোর জন্য পাসপোর্ট পাঠিয়েছিলেন হোম অফিসে সাত বছর পর সে পাসপোর্ট ফিরে এল স্থায়ীভাবে ইংল্যান্ডে থাকার ভিসা নিয়ে এত বছর দেশে ফিরতে পারেননি তিনি পাসপোর্টের অভাবে যখন ফিরে পেলেন, তত দিনে পাসপোর্টের মেয়াদ ফুরিয়ে গেছে তাই নতুন পাসপোর্ট করলেন মা-বাবা দুজনই তারপর গত ডিসেম্বরে দেশে ফিরলেন তিন সপ্তাহের জন্য সাবিরা আর সেবিকা ফাতিমাকে সঙ্গে নিয়ে মায়ের অসুস্থতার কথা শুনে স্ত্রী এসেছিলেন আগেই
আসার সময়ে কী ভেবেছিলেন জানি না; কিন্তু দেশ থেকে তাঁর আর ফেরা হলো না স্নানের ঘরে পড়ে গিয়ে পাঁজর ভেঙে গেল একটি-দুটি নয়, পাঁচটি সেই সঙ্গে দেখা দিল ফুসফুসের জটিলতা তা থেকেই গত ২১ জানুয়ারি শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করে স্থায়ীভাবে দেশেই থেকে গেলেন মুহাম্মদ ইয়ামীন এমনিতে তাঁর স্বাস্থ্য ভালো ছিল ব্যায়ামও করতেন মাঝেমধ্যে হাঁটতেন প্রায়ই দুর্ঘটনা থেকেই তাঁর মৃত্যু কিন্তু তিনি মারা গেলেও পেছনে রেখে গেলেন তাঁর মূর্তিমান সাফল্যসাবিরাকে; আর সন্তানের জন্য একজন সংকল্পবদ্ধ বাবা কী অসাধ্য সাধন করতে পারেন, সেই তুলনাহীন দৃষ্টান্ত
সাবিরা ফিরে এল অক্সফোর্ডে অনেক সম্ভাবনা তার সামনে অনেক সাফল্য আছে তার জন্য অপেক্ষা করে